ফিরে দেখা শিক্ষা

Education in Bangladesh ফিরে দেখা শিক্ষা

ফিরে দেখা শিক্ষা : মহামারী করোনাভাইরাস ২০১৯-এর ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই বিপর্যস্ত করে চলেছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে থমকে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, স্ব্যাস্থ্য, শিক্ষা, উৎপাদন ব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব সুস্পষ্ট। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরটি হলো শিক্ষা।ফিরে দেখা শিক্ষা

করোনার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের দেশে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ হতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে ২০২০ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাও নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের পূর্বের বোর্ড পরীক্ষার ফল এবং বিষয় ম্যাপিং করে গ্রেডিং দেয়া হয় (যা ইতোমধ্যে অটোপাস নামে পরিচিতি পেয়েছে)।

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্তও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে পারাটা বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য। এছাড়াও সকল স্তরে অনলাইন ক্লাস চালু ছিল, যা পুরোপুরি না হলেও আংশিক সফল হয়েছে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করেন।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্নতা রয়েছে। যেমন : সাধারণ শিক্ষা (বাংলা ভার্সন, ইংরেজী ভার্সন) কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ইংলিশ মিডিয়াম (ও এবং এ লেভেল)। সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা ইংলিশ মিডিয়াম তথা ও/এ লেভেলে পড়াশোনা করে। তাদের অনলাইন কার্যক্রম মোটামুটি সফল ছিল বিধায় করোনা নেগেটিভ সনদ সাপেক্ষে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ও/এ লেভেলের পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তিনটি স্তর রয়েছে। প্রাথমিক স্তর (৫ বছর মেয়াদী), মাধ্যমিক স্তর (৭ বছর মেয়াদী), এর মধ্যে জুনিয়র স্কুল তিন বছর, মাধ্যমিক ২ বছর ও উচ্চ মাধ্যমিক ২ বছর এবং উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তর। অপরদিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরেই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।

মহামারীর পুরো সময়জুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি, মানসিক দুর্দশা, কাঠামোগত শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকি এবং শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় সামনে আসে।ফিরে দেখা শিক্ষা

ইউনিসেফের এক গবেষণায় জানা যায়, এই মহামারীর সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনের কাছে অনলাইন শিক্ষা /সেবা পৌঁছানো যায়নি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বস্তুগত সম্পদ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তার অভাব।

এছাড়াও এই কঠিন সময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের অভাব, গৃহস্থালির কাজ করার চাপ বৃদ্ধি এবং বাড়ির বাইরে কাজ করতে বাধ্য হওয়া। এসকল সমস্যা বিবেচনায় এনে সরকার শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে সক্রিয় রাখার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এ্যাসাইনমেন্টের ব্যবস্থা প্রবর্তন করে যা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণী কার্যক্রম চালানো এবং ২০২১ সালের এসএসসি/ এইচএসসি/ জেএসসি/জেডিসি এবং প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাটি অটোপাস হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় সরকার সীমিত পরিসরে হলেও শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ২০২১ নেয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা সকল মহলে প্রশংসিত হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের শ্রেণী কার্যক্রম প্রায় প্রতিদিন এবং অন্যান্য শ্রেণীর কার্যক্রম সপ্তাহে এক/দুইদিন করে শুরু করা হয়। পরবর্তীতে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীদের এক সঙ্গে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা যেন দিতে না হয় সেজন্য আবশ্যিক বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে শুধু ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর ওপর পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং অপর দুটি পরীক্ষা জেএসসি/জেডিসি এবং প্রাথমিক সমাপনী বাতিল করে স্ব-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করে পরবর্তী শ্রেণীতে উন্নীত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এর ফলে হয়তবা ঘাটতি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ওপরের ক্লাসে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা না নিতে পারায় শেখার দক্ষতাও যাচাই করা যাবে না। ফলে আগামী বছরের শুরু থেকেই নতুন উদ্যোম এবং পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান বিষয়ে জোর দিতে হবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নিতে এবং নিয়মিত শিক্ষকদের পাশাপাশি সহায়ক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে হবে।

তবে সুখবর হলো ইতোমধ্যে ১২ বছরের উর্ধে সকল শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রথম ডোজ টিকার আওতায় চলে এসেছে। বাকিদের টিকা দেয়ার কাজ চলমান রয়েছে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। মানুষের মানবিক, দৈহিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের ধারাবাহিক পদ্ধতি হলো শিক্ষা। যে কোন পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের কলকাকলিতে আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখরিত হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ফিরে দেখা শিক্ষা – মোঃ ইকরামুল হক

[ সৌজন্যে জনকণ্ঠ]

আরও পড়ুন:

আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা – নিজেই আবেদন করবেন যেভাবে

You May Also Like

About the Author: admin

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।